যেভাবে সহজে আপনি পুঁইশাক চাষ করবেন

কিভাবে সহজে পুঁইশাক চাষ করবেন জেনে নিন

 

পুইশাক হচ্ছে এক প্রকারের শাক জাতীয় সবজি । এটি আমরা রান্না করে খায়, ভাজি করে খায় । এটি বিভিন্ন ভাবে খাওয়া যায় । এটি খেতে মোটামুটি ভালোই লাগে । পুঁইশাক খেলে শরীরের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়, হজম শক্তি বাড়ে এবং ত্বক ও চোখ ভালো থাকে ।


তবে অতিরিক্ত খেলে ডায়রিয়া, আমাশয় ইত্যাদি রোগ হতে পারে । যাদের কিডনি ও ইউরিক এসিডের সমস্যা আছে, তাদের জটিলতা বাড়তে পারে । তাই এই সব রোগে যারা ভুগছেন তাদের পুইশাক না খাওয়াই ভালো ।

পেজ সূচিপত্রঃ পুঁইশাক চাষ করা সম্পর্কে আজ আমরা যা নিয়ে আলোচনা করব তা হল 

পুঁইশাক কি ? 

পুঁইশাক হল এক জাতীয় শাক ।  এটি আমরা বিভিন্নভাবে তরকারি রান্না করে খেয়ে থাকি । এই শাক দুই কালারের হয়ে থাকে । একটি হল সবুজ কালার আর একটি হলো লাল কালার । দুই কালারের শাকই খেতে মজা লাগে । শীতকালে আবারএই পুঁইশাকে মুচরি ধরে । এই মুচরি খেতেও অনেক মজা লাগে । এই মুচরি ভাজি করে খেতেও অনেক মজা লাগে । 

পুইশাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও ফাইবার । যা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর হয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, হজম শক্তি বৃদ্ধি করে ইত্যাদি । তাই ভিটামিনের অভাব পূরণ করতে আমরা মাঝে মধ্যে পুঁইশাক খেতে পারি । পুঁইশাক ভাজি করে খায়, আবার ঝোল জাতীয় তরকারি যেমন মাছ দিয়ে, ডাল দিয়ে ইত্যাদি দিয়ে রান্না করেও খায় । 

পুঁইশাক খাওয়ার গুনাগুণ 

পুঁইশাক খাওয়ার অনেক গুনাগুন বা উপকারিতা রয়েছে । কারণ পুঁইশাকে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এবং ফাইবার রয়েছে । যা আমাদের শরীরে ভিটামিনের অভাব দূর করে । পুইশাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে । তাই বুঝতেই পারছেন পুইশাক খেলে একই সঙ্গে কতগুলো পুষ্টি পাওয়া যাবে । তাই আপনারা নিয়মিত বা মাঝে মধ্যে পুঁইশাক রান্না করে খেতে পারেন । 

পুঁইশাক গ্রীষ্মকালীন একটি সবজি । কিন্তু এখন বর্তমানে সারা বছরই পুঁইশাক পাওয়া যায় । প্রায় সব জায়গায় এখন পুঁইশাক চাষ করা হয় । তাই এর সকল পুষ্টিগুণ পেতে চাইলে, আপনি নিয়মিত বা মাঝে মধ্যে পুঁইশাক খেতে পারেন । এটি আপনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে রান্না করে খেতে পারেন । এটি খেয়ে আপনার শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফাইবারের অভাব দূর করতে পারেন । 

পুঁইশাক খাওয়ার ক্ষতিকর দিক 

পুইশাক খাওয়ার অনেক গুনাগুন রয়েছে এবং পুঁইশাক চাষ করা অনেক সহজ । কিন্তু এর সামান্য কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে । সেগুলো সম্পর্কে জানবো এবং সতর্কভাবে এটি খাব । অক্সলেট ও পিউরিন থাকায় কিডনিতে পাথর ও ইউরিক অ্যাসিড বা গেঁটেবাত রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে । অতিরিক্ত আঁশযুক্ত হওয়ায় বেশি খেলে পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়া হতে পারে ।


এটি খেলে যাদের অ্যালার্জি আছে, তাদের এলার্জি সমস্যা বেড়ে যেতে পারে এবং হালকা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দিতে পারে । তাই যাদের এই সমস্যাগুলো রয়েছে তারা পুঁইশাক থেকে দূরে থাকতে পারেন । না হলে দেখা যাচ্ছে সে সমস্যাগুলো বেড়ে যেতে পারে এবং আপনি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন । তাই সুস্থ থাকার জন্য অবশ্যই এগুলো মেনে চলতে হবে ।

পুঁইশাক চাষ পদ্ধতি 

পুইশাক বাংলাদেশের প্রধান গ্রীষ্মকালীন পাতা জাতীয় সবজি । তবে সারা বছর ধরেই এই সবজি পাওয়া যায় । এতে ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে । পুঁইশাক সাধারণত বসতবাড়ির আঙিনার বেড়ায় বা মাচায় জন্মাতে দেখা যায় । এছাড়াও ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চাষ করা হয় । এই পুই শাকের অনেক চাহিদা রয়েছে । অনেক মানুষ পুঁইশাক প্রচুর খায় এবং অনেক পছন্দ করে । 

গ্রামে সাধারণত অনেক খোলা জায়গা বা পরিত্যক্ত জায়গা থাকে । তাই গ্রামঅঞ্চলে মাঠে ঘাটে যে কোন জায়গায় গাছ লাগিয়ে দিলে পুঁইশাক সুন্দর চাষ করা হয় । কিন্তু শহরে যেহেতু জায়গা নেই, সেহেতু আপনি চাইলে ছাদের উপরে বা বেল্কুনিতে গাছ লাগিয়ে চাষাবাদ করতে পারেন । এর জন্য আপনাকে তেমন কোন পরিশ্রম করতে হয় না । 

জমি তৈরি 

সাধারণত মার্চ-এপ্রিল বা চৈত্র মাস পুঁইশাক লাগানোর উপযুক্ত সময় । তবে সেচের সুবিধা থাকলে ফাল্গুন মাস হতেই এর চাষ করা যেতে পারে । চারা রোপনের পূর্বে জমি ভালোভাবে চাষ ও ময় দিয়ে ঝুরঝুরা করে তৈরি করে নিতে হবে । এ সবজি চাষের জন্য উর্বর বেলে দোআঁশ  ও দোআঁশ  মাটি উত্তম । তাই পুঁইশাক চাষ করার জন্য দোআঁশ মাটি ব্যবহার করতে পারেন । 

গ্রামাঞ্চলে এভাবে জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে ও মই দিয়ে জমি তৈরি করা হয় । পুঁইশাক চাষ করার জন্য শহরে যেহেতু ফাঁকা জায়গা নেই, সেহেতু ছাদের উপরে বালটিতে মাটি ভর্তি করে নিয়ে এসে বালটির মধ্যে আপনি গাছ লাগাতে পারেন । গাছ যখন বড় হবে তখন আপনি বাহান করে দিলে, সে বাহানে গাছ আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে । 

সার প্রয়োগ 

আপনি যেকোনো চাষাবাদ করার ক্ষেত্রে অর্থাৎ যে কোন গাছ লাগানোর পর আপনাকে গাছে নিয়মিত সার প্রয়োগ করতে হবে । সার প্রয়োগ না করলে গাছ বড় হবে না বা পুষ্টিগুণ পাবে না । তাই গাছের পরিচর্যা হিসেবে আপনাকে গাছে বিভিন্ন ধরনের সার প্রয়োগ করতে হবে । যাতে করে গাছটি সুন্দরভাবে বড় হয় এবং ফুল ফল দেয় । 

পুঁইশাক চাষে গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা ভালো । এতে মাটির গুনাগুন বজায় থাকবে ও পরিবেশ রক্ষা হবে । পুঁইশাকের জন্য প্রতি শতকে বা ৪০ বর্গমিটার জমিতে নিম্নরূপ সার ব্যবহার করতে হবে । যেমন গোবর ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমপি ৫০০ গ্রাম ইত্যাদি । তাহলে দেখবেন পুঁইশাক সুন্দর তরতাজা হয়ে উঠবে ।     

সার প্রয়োগের নিয়মাবলী 

জমিতে সার প্রয়োগের কিছু নিয়মাবলী রয়েছে । সেই নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে সার প্রদান করতে হবে । ইউরিয়া ছাড়া সব সার জমির শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে । তবে গোবর জমি তৈরির প্রথম দিকে প্রয়োগ করা উত্তম । তাহলে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশে যায় । প্রতিটি গাছ লাগানোর পরপরই গোবর দিয়ে লাগাতে হয় ।


এতে করে গাছটি ভালোভাবে বসে । ইউরিয়া সার চারা গজানোর ৮ - ১০ দিন পর থেকে ১০ - ১২ দিন পরপর ২ - ৩ কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে । এতে করে সার ভালোভাবে মাটির সাথে মিশে যাবে এবং মাটির গুনাগুন বৃদ্ধি করবে । এতে করে ফসলের অনেক ভালো ফলন হবে ।

বীজ বপন ও চারা রোপণ 

বীজ বপন করা ও চারা রোপন করার ও একটি নিয়ম কানুন রয়েছে । আপনি যদি সে নিয়ম কানুন অনুযায়ী করেন, তাহলে আপনি কাঙ্খিত ফলাফল পাবেন । মার্চ-এপ্রিল মাসে বৈশাখের বীজ বপন করতে হয় । বীজ ও শাখা কলম দিয়ে পুই এর চাষ করা যায় । তবে বিচ দিয়ে চারা তৈরি করে এবং তা রোপণ করে চাষ করাই ভালো । 

পুইশাকের চারা ৬০ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে শাড়ি করে ও শাড়িতে ৫০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে রোপন করতে হবে । বর্ষার সময় পুইশাকের লতার কিছু অংশ কেটে মাটিতে রোপন করা যায় । আপনি উপরোক্ত নিয়ম অনুযায়ী বীজ বপন এবং চারা রোপণ করতে পারেন । আপনি আপনার বসতবাড়িতে একটি গাছ লাগিয়েও চাষ করতে পারেন, নিজের খাওয়ার জন্য । 

পরিচর্যা 

শুধুমাত্র চারা রোপণ এবং বীজ বপন করে দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না । সেই গাছকে অনেক পরিচর্যা বা দেখাশোনা করতে হয় । তবেই আপনি একটি কাঙ্খিত ফল পাবেন । একটি গাছ অনেক পরিচর্যা করার পর একটি ভালো ফসল দেয় । তাই কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়ার জন্য আপনাকে অনেক পরিশ্রম এবং কষ্ট করতে হবে ।

নিড়ানি দিয়ে জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে । খরার সময় নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে । সেজের পর নিড়ানি দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে দিতে হবে । জমিতে যাতে পানি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে ।  গাছে ফল না আসা পর্যন্ত আপনাকে অনেক ধরনের পরিশ্রম করতে হয় । তবেই আপনি আপনার মন মত একটি ফসল পাবেন । 

পোকামাকড় 

শুধুমাত্র পুঁইশাক নয়, প্রতিটি গাছে অনেক পোকামাকড় হয়ে থাকে । এক একটি গাছে একেক রকমের পোকামাকড় থাকে । এই পোকামাকর গাছপালার অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে থাকে । তাই বিশেষ করে যখন ফল ধরার সময় হয় তখন এই পোকামাকড় অনেক ক্ষতি করে । তাই এই ক্ষতি থেকে উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন কীটনাশক বা ওষুধ দেওয়া হয়, যাতে করে এই পোকামাকড় গাছের কোন ক্ষতি না করতে পারে ।


পুইশাকের ক্ষতিকর পোকার মধ্যে একটি হচ্ছে  শুয়োপোকা । এই পোকা গাছের পাতা, কচি ডগা খেয়ে ক্ষতি করে থাকে । তাই এই পোকার হাত থেকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন ওষুধ গাছে প্রয়োগ করতে হবে বা কীটনাশক ছিটাতে হবে । তবেই আপনি এই প্রকার হাত থেকে মুক্তি পাবেন বা গাছকে রক্ষা করতে পারবেন । 

ফসল সংগ্রহ ও ফলন 

পুইশাকের ডগা লম্বা হতে শুরু করলেই ডগা কেটে সংগ্রহ করতে হবে । এভাবে ডগা কেটে সংগ্রহ করলে নতুন ডগা গজাবে । এভাবে নতুন ডগা কয়েকবার কেটে ফসল সংগ্রহ করা যায় । ভালোভাবে চাষ করলে প্রতি শতকে ১৩০ থেকে ১৫০ কেজি পুঁইশাকের ফলন পাওয়া যায় । আপনি যত কাটবেন তত ডালপালা বের হতে থাকবে এবং ফলন বাড়তে থাকবে । 

তাই আপনি এভাবে ফসল সংগ্রহ করতে পারেন এবং ফলন বৃদ্ধি করতে পারেন । পুঁইশাক গাছের ফসল এভাবে সংগ্রহ করতে হয় । আপনি যদি বসত বাড়িতে পুঁইশাক চাষ করেন বা ছাদের উপরে চাষ করেন ঠিক একই ভাবে ডগা কেটে কেটে ফসল সংগ্রহ করতে পারেন । আসলে এভাবেই পুঁইশাকের ফসল সংগ্রহ করা হয় । 

উপসংহার 

আপনি যদি পুঁইশাক চাষ করতে চান তাহলে, উপরোক্ত নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে পুঁইশাক চাষ করতে হবে । তাই এইভাবে যদি আপনি পুঁইশাক চাষ করেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে একদিন কাঙ্খিত ফলাফল পাবেন । বর্তমানে পুঁইশাকের অনেক চাহিদা রয়েছে । তাই আপনি যদি পুঁইশাক চাষ করেন তাহলে ভালো লাভ করতে পারবেন । 

তাই আপনি চাইলে শহরে এবং গ্রামে যে কোন জায়গায় পুঁইশাকের চাষ করতে পারেন । আর্টিকেলটা কেমন হয়েছে কমেন্টে জানাবেন । কোন ভুল ত্রুটি হলে মাফ করবেন । সবাই ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন । সবাইকে অনেক ধন্যবাদ । 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url