শীতকালে সিলেটের মনোরম এবং দর্শনীয় স্থান
শীতকালে সিলেটের দর্শনীয় ও মনোরম স্থান
বাংলাদেশের ছয়টি ঋতু রয়েছে । তার মধ্যে প্রধানত ধরা হয় শীতকাল এবং গরমকাল । বাংলাদেশে শীতকালের চেয়ে গরমকাল বেশি সময় থাকে । বেশিরভাগ মানুষই শীতকাল বেশি পছন্দ করে । আর এই শীতকালে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতে পছন্দ করে ।
শীতকালে অনেকেই ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান খুঁজে থাকেন ।
বাংলাদেশের সিলেটে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান রয়েছে । সেখানে রয়েছে চা বাগান,
মাজার, আরো অনেক মনোরম দৃশ্য । আজ আমরা এই ব্লগে দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে
আলোচনা করব ।
পেজ সূচিপত্রঃ সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে আজ আমরা আলোচনা করব
- জাফলং
- সুরমা নদী
- হযরত শাহজালাল মাজার
- হযরত শাহপরানের মাজার
- মালনিছড়া চা বাগান
- লাক্কাতুরা চা বাগান
- শুকতারা প্রকৃতি নিবাস
- সুরমা সেতু
- লালা খাল
- ডিবির বিল
- শেষ কথা
জাফলং
সিলেটে বেড়াতে গিয়ে কেউ জাফলং যায়নি এমন হতেই পারে না । কারণ সিলেটের
সবচেয়ে সুন্দর এবং মনোরম টুরিস্ট স্পটের মধ্যে জাফলং একটি । সিলেট জেলার
গোইয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত জাফলং, যা সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর
পূর্ব দিকে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের
পাদদেশে অবস্থিত । জাফলং প্রকৃতির কন্যা হিসেবে পরিচিত ।
ওপারে পাহাড়, এপারে নদী পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে ঝরনা । আবার নদীর বুকে
সাজানো নানা রঙের পাথর প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য আর কোথাও পাওয়া যাবে না
জাফলং ছাড়া । ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, উঁচু পাহাড়, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা,
সবকিছুই দেখতে পাওয়া যায় এই জাফলং এ । তাই সিলেট এসে জাফলং যদি না
আসেন তাহলে ঘুরতে আসায় অপূর্ণ থেকে যাবে ।
সুরমা নদী
নদী আসলে দেখার কিছু থাকে না । সব নদী মোটামুটি দেখতে একই রকম হয় । তারপরেও
নদীর সামনে গেলে কেন জানি শান্তি পাওয়া যায় । তাই অনেকেই অবসর সময়ে বা
ঘুরে ফিরে বেড়ানোর জন্য নদীর ধারে বেড়াতে যায় । বাংলাদেশে অনেকগুলো নদী
রয়েছে । তার মধ্যে একটি নদী সিলেটে অবস্থিত, যার নাম সুরমা । তাই আপনার ঘুরতে
গেলে অবশ্যই সুরমা নদী যাবেন ।
বাংলাদেশের অন্যতম নদী সুরমা নদীটি বয়ে গেছে সিলেট শহরের দক্ষিণ পাশে । সুরমা
নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় সিলেট শহরের চাঁদনী ঘাট থেকে । অতিরিক্ত দূষণের
কারণে দিন দিন নদীটি দূষিত হয়ে পড়ায় এর সৌন্দর্যে ভাটা পড়েছে । তারপরেও
আপনারা যদি সিলেট ঘুরতে যান অবশ্যই সুরমা নদী ঘুরতে যাবেন ।
হযরত শাহজালাল মাজার
হযরত শাহজালালের মাজারটি সিলেটের অন্যতম দর্শনীয় স্থান । ১৩০৩ সালে হযরত
শাহজালালের হাতে এ অঞ্চলটি পরাজিত হয় । তারপর ১৩১৩ জন শীর্ষ সহ ইসলাম ধর্ম
প্রচার করার উদ্দেশ্যে তুরস্কের কনিয়া শহর থেকে তিনি এ দেশে আসেন । ১৩৪০
খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পর তাকে এখানে সমাহিত করা হয় । তারপর সেখানে
এলাকার এবং অনেক পর্যটক ঘুরতে যান ।
আরও পড়ুন ঃ সিলেটে আর কোন কোন মাজার রয়েছে ?
হযরত শাহজালাল এর মাজার কমপ্লেক্সরের ভেতরে শত শত জালালী কবুতর, পুকুর ভর্তি
মাছ, এছাড়াও হযরত শাহজালাল এর ব্যবহৃত তালোয়ারটি এখনো আছে । প্রতিবছর হযরত
শাহজালালের মাজার দেখার জন্য প্রচুর মানুষ ভিড় করে । তাই আপনি যদি সিলেট যান
তাহলে অবশ্যই হযরত শাহজালালের মাজারটি দেখে আসতে পারেন ।
হযরত শাহপরানের মাজার
সিলেটে শাহজালালের যেমন একটি মাজার রয়েছে, ঠিক তেমনি আরো একটি মাজার রয়েছে ।
সেটি হল হযরত শাহপরানের মাজার । হযরত শাহজালালের ভাগ্নে অর্থাৎ বোনের ছেলে
ছিলেন হযরত শাহপরান । এ মাজারটি অবস্থিত শহরের পূর্ব দিকটাই দক্ষিণ গাছের খাদেম
পাড়ায় । এই মাজারে রয়েছে বিশাল একটি বট গাছ । প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তরা
আসেন হযরত শাহপরানের মাজারে ।
তাই আপনি যদি সিলেট ঘুরতে যান তাহলে অবশ্যই হযরত শাহপরানের মাজার ঘুরতে যাবেন ।
সেখানে যাওয়ার জন্য আপনি সিলেট শহরে যে কোন প্রান্ত থেকে সিএনজি, রিক্সা বা
অটোরিক্সা করে খুব সহজেই যেতে পারেন । তাই আপনি আপনার সুবিধা মত যে কোন
যানবাহনে করে মাজারে যেতে পারেন ।
মালনিছড়া চা বাগান
সিলেট শহর বিখ্যাতই চা বাগানের জন্য । সিলেটে প্রচুর পরিমাণে চা বাগান রয়েছে ।
তার মধ্যে একটি হচ্ছে মালনি ছড়া চা বাগান । বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন চা
বাগান মালনিছড়া চা বাগান । সিলেট শহর থেকে বিমানবন্দর যেতে দেখতে পাওয়া
যায় মালনিছড়া চা বাগানটি । তাই আপনি সিলেট ঘুরতে গেলে মালনিছড়া চা
বাগানটি অবশ্যই দেখে আসবেন ।
হার্ডসনের হাত ধরেই ১৮৫৪ সালে যাত্রা শুরু করে মালনিছড়া চা বাগানটি ।
উঁচু নিচু জায়গায় দেখতে এ চা বাগানটি খুবই সুন্দর । এ চা বাগানে রয়েছে
প্রচুর পরিমাণে বানর । সিলেট শহরের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে রিক্সা, অটোরিকশা বা
সিএনজি ভাড়া করে মালনিছড়া চা বাগান দেখতে যেতে পারেন । তাই এভাবে আপনিও যেতে
পারেন ।
লাক্কাতুরা চা বাগান
সিলেটে যে সকল চা বাগান রয়েছে, তার মধ্যে আরেকটি হচ্ছে লাক্কাতুরা চা বাগান ।
লাক্কাতুরা চা বাগান সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম । সিলেটের শহর
থেকে বিমানবন্দরে যেতে এই চা বাগান দেখতে পাওয়া যায় । চা বাগানটি দেখার জন্য
প্রতি বছর অনেক মানুষ ভ্রমণে আসে । ন্যাশনাল টি কোম্পানির মালিকানাধীন এ
চা বাগান টি দেখতে খুবই সুন্দর এবং নিরাপদ ।
আরও পড়ুনঃ সিলেটে মোট কতটি চা বাগান রয়েছে ?
তাই আপনি যদি এর মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে চান, তাহলে অবশ্যই লাক্কাতুরা চা
বাগান ঘুরতে যাবেন । সিলেট থেকে স্থানীয় পরিবহনে খুব সহজেই লাক্কাতুরা চা
বাগান ঘুরতে যেতে পারবেন । তাই সিলেট ঘুরতে গেলে অবশ্যই লাক্কাতুরা চা
বাগান ঘুরে আসবেন ।
শুকতারা প্রকৃতি নিবাস
সিলেটে ঘুরতে যেয়ে আরো একটি পর্যটক কেন্দ্র হচ্ছে শুকতারা প্রকৃতি নিবাস । কোন
জায়গায় শুধু ঘুরতে গেলে হবে না, সেখানে থাকার জন্য একটি ভালো জায়গার ও প্রয়োজন
রয়েছে । তাই কোথাও ঘুরতে গেলে অবশ্যই আপনি ভালো জায়গা নিবেন । আর সেই ভালো
জায়গাটি হচ্ছে শুকতারা প্রকৃতি নিবাস ।
সিলেটের ৭ একর জায়গা জুড়ে খাদিমনগরের উদ্দিনের টিলায় সবুজে ঘেরা এক স্বর্গ
সুখ তারা প্রকৃতির নিবাস । এ জায়গাটি দেখতে খুবই সুন্দর । সিলেটে যারা ভ্রমন
করতে যান তারা থাকার জন্য এই জায়গাটি বেছে নিতে পারেন । এর মনোরম পরিবেশ
আপনাকে অবশ্যই আকৃষ্ট করবে ।
সুরমা সেতু
১৯৩৬ সালে লোহার তৈরি কিন ব্রিজটি নির্মাণ করা হয় । এটি সুরমা সেতু নামে বেশ
পরিচিত । ইংরেজ গভর্নর মাইকেল কিনের নামে নামকরণ করা হয় । এই সেতুটি ১১৫০ ফুট
লম্বা এবং ১৮ ফুট প্রস্থ । এই সেতুটি দেখতে ধনুকের মতো বাঁকানো । স্বাধীনতা
যুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী সেতুটির একাংশ উড়িয়ে দেয় ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অর্থায়নে বিধ্বস্ত অংশটি ১৯৭৭ সালে পুনঃনির্মাণ করা হয় ।
সিলেট শহরের যে কোন স্থান থেকে রিকশা, সিএনজি ও অটোরিকশা করে সুরমা সেতু খুব
সহজেই যাওয়া যায় । সিলেট রেলস্টেশন থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে আপনি হেটেও
ঘুরে আসতে পারবেন । তাই সিলেট ঘুরতে গেলে আপনি অবশ্যই সুরমা সেতু ঘুরে
আসবেন ।
লালা খাল
লালাখাল হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের স্থান । এটি সিলেট জেলার
জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত । স্বচ্ছ নীল জলের লালাখাল সিলেটের সুন্দরতম
দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি । স্পিড বোট ও নৌকা দিয়ে ঘুরে দেখতে পারেন লালা খাল
। লালাখাল যাওয়ার পথে আপনার দুই চোখ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাবে ।
কিন্তু সৌন্দর্য দেখার শেষ হবেনা ।
আরও পড়ুনঃ সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে
৪০ থেকে ৫০ মিনিট যাত্রা শেষে আপনি পৌঁছে যাবেন লালাখাল চা বাগানের ফ্যাক্টরির
ঘাটে । লালাখালের অবস্থান হল ভারতের চেরাপুঞ্জির ঠিক নিচেই । প্রতিবছর রাতের
সৌন্দর্যে ভরপুর লালাখাল দেখতে ভিড় করেন পর্যটকরা ।
সিলেট শহরে নেমে সেখান থেকে জাফলং এর গাড়িতে উঠে সারিঘাট নেমে যাবেন । সারিঘাট
থেকে লালাখালে যাওয়ার সিএনজি চালিত অটোরিক্সা পাবেন । নদীপথে লালাখাল যেতে চান
তবে এখানে ইঞ্জিন চালিত বিভিন্ন ট্রলার নৌকা ভাড়া পাবেন ।
ডিবির বিল
সিলেট শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ডিবির বিল । বাংলাদেশ ভারত
সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে চারটি বিল রয়েছে । বিলগুলো হচ্ছে ডিবি
বিল, কেন্দ্রী বিল, হরফফাটা বিল ও ইয়াম বিল । সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার
উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত পাশাপাশি চারটি বিল । এ বিলের পানিতে রয়েছে শত শত
লাল শাপলা ।
লাল শাপলার কারণে বিলের জল প্রায় দেখা যায় না । সেখানে দেখা মিলবে চোখ
জুড়ানো এমন দৃশ্যের । ডিবির বিল নামে স্থানীয়দের কাছে পরিচিতি পেয়েছে ।
পড়ন্ত রোদ পড়ার আগে ডিবির বিলের আসল সৌন্দর্য দেখতে পাওয়া যায় । সিলেট থেকে
লোকাল বাসে প্রথমে লালাখাল বাজার, সেখান থেকে ডিবির বিল যাওয়া যায় ।
শেষ কথা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের বেড়ানোর জায়গা অনেক রয়েছে । উঁচু
নিচু পাহাড় আর চা বাগান পর্যটকদের মন কেড়ে নেয় । ওপারে ভারত এপারে
বাংলাদেশের লালাখাল, জাফলং, বিছানাকান্দি, আরো অনেক কিছু আছে । এছাড়াও
রয়েছে হযরত শাহজালাল ও হযরত শাহপরানের মাজার ।
পরিশেষে বলা যায়, শীতকালে ভ্রমণের জন্য সিলেট জেলা উপযুক্ত । সিলেট জেলাতে
বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করার জন্য বিভিন্ন রকমের পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে । এসব
পর্যটন কেন্দ্রে প্রতি বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে হাজার হাজার
পর্যটকরা ভ্রমণ করতে আসে । তাই আপনিও চাইলে যেতে পারেন এই সুন্দর জায়গায় ।
কোন ভুল ত্রুটি হলে মাফ করবেন । আর আর্টিকেলটা কেমন হয়েছে কমেন্টে অবশ্যই
জানাবেন । সবাই ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন । সবাইকে অনেক ধন্যবাদ
।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url