শীতকালে আধুনিক পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করুন

শীতকালে আধুনিক পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করার নিয়ম 

 

বেগুন খুবই পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি সবজি । এটি আমরা প্রায় প্রতিটি খাবারেই ব্যবহার করে থাকি ।  অর্থাৎ আমরা প্রায় বেগুনের সবজি রান্না করে থাকি । এতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন ইত্যাদি রয়েছে । যা আমাদের শরীরে বিভিন্ন ভিটামিনের অভাব দূর করে থাকে ।


শীতকাল বেগুন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় । অর্থাৎ শ্রাবণ মাস থেকে আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি  বেগুনের বীজ বপনের জন্য উপযুক্ত সময় । বেগুন দো-আঁশ ও ঝুরঝুরা মাটিতে ভালো ফলন দেয় । তাই বেগুন চাষের জন্য দো-আঁশ মাটি ব্যবহার করতে হবে । 

পেজ সূচিপত্র ঃ বেগুন চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে আজ আমরা যা যা আলোচনা করব তা হল 

বেগুন কি ? 

বেগুন হচ্ছে বহু পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি সবজি । এটি আমরা প্রায় নিয়মিত খেয়ে থাকি । বেগুন শীতকালে চাষ করা হয় । বর্তমানে এখন সারা বছরই বেগুন চাষ করা হয় এবং সারা বছর বেগুন খেতে পাওয়া যায় । তবে শীতকালে বেগুন খেতে বেশি ভালো লাগে । বেগুন আমরা ভাজি করে, তরকারি রান্না করে, মাছ দিয়ে রান্না করে, এছাড়াও বিভিন্নভাবে রান্না করে খাওয়া যায় । 

বেগুনের অনেক রেসিপি রয়েছে । যা আমরা মাঝে মাঝেই বানিয়ে খেয়ে থাকি । বেগুনে ক্যালসিয়াম রয়েছে, আয়রন রয়েছে, ভিটামিন রয়েছে । তাই আমরা যদি বেগুন খায়, তাহলে এ সকল পুষ্টিগুণ গুলো আমরা পেয়ে যাব । তাই আমরা মাঝে মধ্যে বেগুনের সবজি খেতে পারি । এটি আমাদের শরীরের জন্য উপকারী একটি সবজি ।

মাটি তৈরি 

বেগুন চাষ করার জন্য আপনাকে প্রথমে নির্দিষ্ট মাটি ঠিক করতে হবে । অর্থাৎ যে মাটি বেগুন চাষের জন্য ভালো সেই মাটি নির্বাচন করতে হবে । হালকা বেলে থেকে ভারী এটেল মাটি, অর্থাৎ প্রায় সব ধরনের মাটিতেই বেগুন চাষ করা যায় । হালকা বেলে মাটি আগাম জাতের বেগুন চাষের জন্য উপযোগী । এই ধরনের মাটিতে বেগুন চাষ করতে হলে প্রচুর পরিমাণ জৈবসার সহ অন্যান্য সার ঘন ঘন প্রয়োগ করতে হবে । 

এটেল, দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি বেগুন চাষের জন্য উপযোগী এবং এই মাটিতে বেগুনের ফলন বেশি হয় । বেগুন চাষের জন্য নির্বাচিত মাটি গভীর, উর্বর ও সুনিষ্কাসিত হওয়া প্রয়োজন । একটি ফসল চাষ করার জন্য কৃষককে অনেক পরিশ্রম করতে হয় । তার প্রথম ধাপই হচ্ছে প্রথমে মাটি ভালো ভাবে তৈরি করে নিতে হয় ।

বেগুনের জাত 

আমাদের দেশে বিভিন্ন যাদের বেগুন পাওয়া যায় । অর্থাৎ বেগুন একটি সবজি কিন্তু এটি বিভিন্ন ধরনের,  বিভিন্ন কালারের বা বিভিন্ন জাতের হয়ে থাকে । এক একটি জাতের বেগুন দেখতে একেক রকম । আবার খেতে সাদও ভিন্ন ভিন্ন । অর্থাৎ একেক জাতের বেগুনের স্বাদ একেক রকম । বেগুনের বিভিন্ন নাম রয়েছে ।


কয়েকটি বেগুনের নাম হচ্ছে যেমন ঝুমকো বেগুন, ডিম বেগুন, মুক্তকেশী বেগুন, কাজলা বেগুন, তারাপুরী বেগুন, কাঁটা বেগুন, কেজি বেগুন, তাল বেগুন, উত্তরা বেগুন, খটখটিয়া বেগুন ইত্যাদি। এছাড়াও অনেক জাতের বা অনেক নামের বেগুন রয়েছে । সবগুলো খেতেই মোটামুটি ভালো লাগে । তারপরও স্বাদের ভিন্নতার কারণে কিছু কিছু বেগুন বেশি ভালো লাগে ।

চাষের মৌসুম 

বাংলাদেশের জলবায়ুতে বছরের যেকোনো সময়েই বেগুনের চাষ করা যেতে পারে বা করা সম্ভব । তবে রবি মৌসুমে বেগুন চাষ করলে ফলন, খরিপ মৌসুমের চেয়ে বেশি পাওয়া যায় । রবি মৌসুম অর্থাৎ শীতকালের জন্য সাধারণত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময় । খরিপ মৌসুম অর্থাৎ বর্ষাকালীন বেগুনের জন্য জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময় ।

রবি মৌসুমে চাষের জন্য যে কোনো জাতের বেগুন লাগানো যেতে পারে । তবে খরিপ মৌসুমে বা বর্ষাকালে চাষের জন্য বারো মাসি জাত সমূহ লাগাতে হবে । অর্থাৎ বর্ষাকালে যেহেতু ফলন কম হয়, বেগুন চাষের জন্য উপযুক্ত সময় নয়, সেহেতু বর্ষাকালে আপনি বারো মাসি বেগুন চাষ করলে ভালো করবেন । 

চারা তৈরি 

বেগুন চাষের জন্য প্রথমে বীজতলায় চারা করে তা মূল জমিতে রোপণ করতে হবে । বীজতলা এমন স্থানে তৈরি করতে হবে যেখানে বৃষ্টির পানি দাঁড়াবে না । অর্থাৎ সুনিস্কাশিত হতে হবে । সর্বদা আলো বাতাস পায় অর্থাৎ ছায়া মুক্ত হতে হবে । বীজতলা তৈরির জন্য মাটি গভীরভাবে চাষ দিতে হবে ।  বীজতলায় মাটি উর্বর হতে হবে । 

উর্বরতা কম থাকলে জৈব সার ও অন্যান্য সামান্য পরিমান ফসফেট জাতীয় সার ব্যবহার করা যেতে পারে । চাষের পর সম্পূর্ণ জমিকে কয়েকটি ছোট ছোট বীজতলাতে ভাগ করে নিতে হবে । প্রতিটি বীজতলা দৈর্ঘ্যে ৩-৫ ঘন মিটার, প্রস্থে এক মিটার ও পাশ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা রাখা উচিত । 

পাশাপাশি দুটো বীজ তলার মধ্যে ৫০-৬০ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা রাখা উচিত । এ ফাঁকা জায়গা থেকে মাটি নিয়ে বীজতলা উঁচু করে নিতে হবে । অল্প সংখ্যক চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা হিসেবে কাঠের বাক্স, প্লাস্টিকের ট্রে, বড় টব, ব্যবহার করা যেতে পারে । 

জমি তৈরি ও চারা রোপণ 

সাধারণত মাঠের জমি তৈরির জন্য ৪-৫ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটির ঝুরঝুরা করে নিতে হবে । ৩৫-৪৫  দিন বয়সের চারা রোপণের উপযোগী হয় । এ সময় চারাতে ৫-৬ টি পাতা গজায় এবং চারা প্রায় ১৫  সেন্টিমিটার লম্বা হয় । বেগুনের চারার বয়স একটু বেশি হলেও লাগানো যেতে পারে । প্রয়োজনে দুই মাস পর্যন্ত চারা বীজতলায় রেখে দেওয়া যায় । 


চারা তোলার সময় যাতে শিকড় নষ্ট না হয় সেজন্য চারা তোলার ১-২ ঘন্টা আগে বীজ তলায় পানি দিয়ে মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে । চারা রোপণ দূরত্ব জাত, মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন মৌসুমের উপর নির্ভর করে । সাধারণত বড় আকারের বেগুনের জাতের ক্ষেত্রে ৯০ সেন্টিমিটার দূরে সারি করে সারিতে ৬০ সেন্টিমিটার ব্যবধানে চারা লাগানো যেতে পারে । 

ক্ষুদ্রাকার জাতের ক্ষেত্রে ৭৫ সেন্টিমিটার সারি করে সারিতে ৫০ সেন্টিমিটার ব্যবধানে চারা লাগানো যেতে পারে ।  জমিতে চারা লাগানোর পর পরই যাতে চারা শুকিয়ে না যায় সে জন্য সম্ভব হলে বিকেলের দিকে চারা লাগানো উচিত । 

সার প্রয়োগ 

বেগুন মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য শোষণ করে । এর জন্য বেগুনের সন্তোষজনক উৎপাদন সার ব্যাতিত সম্ভব নয় । তাই ভালো ফলন পাবার জন্য বেশি বেশি করে জমিতে সার প্রয়োগ করতে হবে ।  সারের পরিমাণ মাটির উর্বরতা শক্তির উপর নির্ভর করে । মাটি যদি উর্বর হয়, তাহলে সার কম লাগবে ।  আর মাটির উর্বরতা যদি কম হয়, তাহলে সার বেশি লাগবে । 

বেগুন চাষের জন্য হেক্টর প্রতি নিম্নলিখিত পরিমাণে সার সুপারিশ করা যেতে পারে । প্রথম কিস্তি সার চারা লাগানোর ১০-২৫ দিন পর, দ্বিতীয় কিস্তি ফল ধরা আরম্ভ হলে এবং তৃতীয় ফল তোলার মাঝা মাঝি সময় দিতে হবে । জমিতে রস না থাকলে সার প্রয়োগের পর পরই জমিতে সেচ দিতে হবে । 

পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা

পোকামাকড় খুবই খারাপ একটি জিনিস । অর্থাৎ পোকামাকড় খাবার নষ্ট করে, ফসল নষ্ট করে । পোকামাকড় যেমন সবকিছু নষ্ট করে ফেলে, ঠিক একই ভাবে পোকামাকড় বেগুন গাছেরও অনেক ক্ষতি করে থাকে । বেগুনের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হল বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা । কোন কোন এলাকায় ক্ষুদ্র লাল মাকড় প্রধান শত্রু ।

এছাড়া কাটালে পোকা বা ইপলাকনা বিটল, জাব পোকা, ছাতরা পোকা, বিছা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, থ্রিপস, কাটুই পোকা ইত্যাদি বেগুনের ক্ষতি করে থাকে । আইপিএম পদ্ধতিতে এসব পোকা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে । তাছাড়া বেগুন গাছ বা বেগুন নষ্ট করে ফেলবে । তাই পোকামাকড় দমন করা খুবই জরুরী একটি কাজ ।

রোগ ব্যবস্থাপনা  

মানুষের যেমন বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়, ঠিক একইভাবে গাছেরও বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাই হয়ে থাকে । কারণ গাছেরও জীবন রয়েছে । তাই বেগুন গাছেরও বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাই হয়ে থাকে । রোগ বালাই  চিহ্নিত করে তারপর রোগ সারানোর ব্যবস্থা করতে হবে । তাছাড়া ফলন ভালো হবে না এবং আমরা কাঙ্খিত ফসল পাব না । এ দেশে বেগুনের ঢলে পড়া ও গোঁড়া পচা দুটি মারাত্মক রোগ । 


প্রায় বেগুন ক্ষেতেই এ রোগ দেখা যায় । ফল পচা রোগেরও অনেক বেগুন নষ্ট হয় । বীজতলায় ডাম্পিং অফ রোগ চারার মড়ক সৃষ্টি করে । এছাড়া মোজেইক, ক্ষুদে পাতা, শিকড়ে গিট ইত্যাদি রোগও বেগুন ফসলের যথেষ্ট ক্ষতি করে থাকে । তাই এ সকল রোগবালাই গুলো চিহ্নিত করতে হবে । তারপর সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে । যাতে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় । 

ফলন ও ফসল সংগ্রহ 

ফল সম্পূর্ণ পরিপক্ক হওয়ার পূর্বে সংগ্রহ করতে হবে । ফল যখন পূর্ণ আকার প্রাপ্ত হয় অথচ বীজ শক্ত হয় না, তখন ফল সংগ্রহ করার উপযুক্ত সময় । সংগ্রহের সময় ফলের ত্বক উজ্জ্বল ও চকচকে থাকবে । অধিক পরিপক্ক হলে ফল সবুজ ভাব, হলুদ অথবা তামাটে রং ধারণ করে এবং শাঁস শক্ত ও স্পঞ্জের মত হয়ে যায় । 

অনেকে হাতের আঙ্গুলের চাপ দিয়ে ফল সংগ্রহের উপযুক্ত কি না তা নির্ধারণ করতে পারেন  এক্ষেত্রে দুই আঙ্গুলের সাহায্যে চাপ দিলে যদি বসে যাই এবং চাপ তুলে নিলে পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে তবে বুঝতে হবে বেগুন কচি রয়েছে । আর চাপ দিলে যদি নরম অনুভূত হয়, অথচ বসবে না এবং আঙ্গুলের ছাপ থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সংগ্রহের উপযুক্ত হয়েছে । 

বেশি কচি অবস্থায় ফল সংগ্রহ করলে ফলের গুণ ভালো থাকে, তবে ফলন কম পাওয়া যায় । ফলের বৃদ্ধি থেকে শুরু করে পরিপক্ক পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছানো পর্যন্ত বেগুন খাওয়ার উপযুক্ত থাকে । সাধারণত ফুল ফোটার পর ফল পেতে প্রায় এক মাস সময় লাগে । 

শেষ কথা 

পরিশেষে বলা যায়, বেগুন খুবই জনপ্রিয় একটি সবজি । এই সবজি আমাদের খেতেই হয় । বলতে গেলে বেগুন হচ্ছে আমাদের প্রধান সবজি । তাই এর পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে আমরা খেতে পারি । গ্রামাঞ্চলে যাদের অনেক ফাঁকা জায়গা রয়েছে, তারা বেগুনের চাষ করতে পারেন । কিন্তু শহর অঞ্চলে যাদের জায়গা নেই, তারা বাসার ছাদে টবে একই পদ্ধতি অবলম্বন করে বেগুনের চাষ করতে পারেন ।

এখন বর্তমানে শহরে টবে প্রায় মানুষ বেগুনের চাষ করে থাকে । আর ফলন ভালোই হয় । বিক্রি করতে না পারলেও অন্তত বাসায় খাওয়া যায় । আর্টিকেলটা কেমন হয়েছে কমেন্টে জানাবেন । ভুল ত্রুটি হলে মাফ করবেন । সবাই ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন । সবাইকে অনেক ধন্যবাদ । 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url